সোনা কেনার সময় ক্যারেট, হলমার্কসহ যেসব বিষয়ে জানা জরুরি

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সজল দাস
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
সম্পদ ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে হাজার বছর ধরে টিকে আছে মূল্যবান ধাতু স্বর্ণ। বিয়ে হোক কিংবা বিনিয়োগ, মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এটি। তবে আধুনিক যুগে স্বর্ণ কেনার সময় 'ক্যারেট', 'হলমার্ক' বা 'খাদ'- এই শব্দগুলো বেশ ভাবায় সবাইকে।
স্বর্ণের বিশুদ্ধতা মাপার আন্তর্জাতিক একক হলো ক্যারেট। বিশুদ্ধতার মাত্রা অনুযায়ী ২৪, ২২, ২১ এবং ১৮ ক্যারেটে স্বর্ণকে ভাগ করা হয়।
২৪ ক্যারেট সব থেকে খাঁটি স্বর্ণ হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ২২ ক্যারেট বা তার কম ক্যারেটের স্বর্ণই দৈনন্দিন জীবনে ক্রয়-বিক্রয় বা লেনদেনের ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহার হয়।
তাহলে কি ভেজাল মিশ্রিত স্বর্ণ কিনছে সবাই?
এছাড়া স্বর্ণের ওজন পরিমাপের একক নিয়েও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশে ভরি, আনা, রতি শব্দগুলো অনেক বেশি প্রচলিত হলেও বৈশ্বিক পরিসরে স্বর্ণের ওজন পরিমাপের মূল একক ট্রয় আউন্স এবং গ্রাম।
বাংলাদেশে স্বর্ণ ক্রয়-বিক্রয়ের সময় ভরি বা আনার হিসেব সামনে এলেও মূল হিসেবটা হয় গ্রাম এককেই।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুস প্রতিদিন দেশের স্বর্ণের বাজারে যে দাম নির্ধারণ করে সেটি মূলত গ্রাম হিসেবেই করা হয়।
বাজুস সভাপতি এনামুল হক খান দোলন বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকেই ভরি বা আনার হিসাব একটি প্রচলিত ধারায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু "বর্তমান সময়ে যারা স্বর্ণ ব্যবসা করেন তারা কিন্তু গ্রামের হিসেবেই কেনাবেচা করেন"।
ক্রেতাদের বোঝার স্বার্থে বাংলাদেশে স্বর্ণ ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় গ্রাম থেকে ভরির হিসেবে কনভার্ট বা পরিবর্তন করে নেওয়া হয়। যে হিসেব নিয়েও মাঝেমধ্যে বেশ জটিলতায় পড়েন অনেক ক্রেতা।
এছাড়া স্বর্ণের ক্ষেত্রে 'খাদ' শব্দটিও বেশ পরিচিত। সাধারণত খাদ মেশানো মানে 'ঠকানো' বলেও মনে করা হয়। কিন্তু স্বর্ণের ক্ষেত্রে খাদ মেশানো কেন প্রয়োজন এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো ��ড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
স্বর্ণের ক্যারেট বলতে কী বোঝায়?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ক্যারেট বলতে মূলত স্বর্ণের বিশুদ্ধতা বা মান বোঝায়। সোনার অলঙ্কারে কতটুকু খাঁটি স্বর্ণ আছে এবং কতটুকু অন্য ধাতু মেশানো হয়েছে, তা এই ক্যারেট দিয়ে পরিমাপ করা হয়।
সাধারণত অত্যন্ত নরম খনিজ পদার্থ হিসেবে খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়। তাই এটি দিয়ে সাধারণত গহনা তৈরি করা যায় না। কয়েন বা বিস্কুট আকারে সংরক্ষণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়।
খনি থেকে উত্তোলণের পর প্রায় শতভাগ খাঁটি নরম এই স্বর্ণই ২৪ ক্যারেট হিসেবে পরিচিত। এতে অন্য কোনো ধাতু মেশানো থাকে না।
পরবর্তীতে এই স্বর্ণ দিয়ে গহনা তৈরি বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য এতে তামা, রুপা, দস্তা বা নিকেলের মতো ধাতু মিশিয়ে শক্ত করা হয়, যা 'খাদ' হিসেবে পরিচিত।
এক্ষেত্রে 'খাদ' যত বেশি মেশানো হবে, স্বর্ণের বিশুদ্ধতা তত কমবে। একই সঙ্গে স্বর্ণের ক্যারেটও তত নিচে নামবে।
বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে ২৪ ক্যারেটের পরই ২২ ক্যারেট। স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশে গহনা তৈরির জন্য ২২ ক্যারেটেই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
এই ক্যারেটের স্বর্ণ ৯১ দশমিক ৬৭ শতাংশ খাঁটি। মূলত টেকসই গহনা বানানোর জন্যই নরম স্বর্ণের সঙ্গে তামা, রূপা বা দস্তার মতো অন্য ধাতু মেশানো হয়।
"চুড়ি, কানের দুল, নাকফুল থেকে শুরু করে অধিকাংশ জুয়েলারিই এই ক্যারেটে তৈরি হয়," জানান যশোরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী রতন সরকার।
বাংলাদেশে ২১ ক্যারেট স্বর্ণও বেশ প্রচলিত। আন্তর্জাতিক গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুসারে, এই ধরনের স্বর্ণ ৮৭ দশমিক পাঁচ শতাংশ খাঁটি। এটি ২২ ক্যারেটের চেয়েও অনেক বেশি শক্ত এবং টেকসই।
মি. সরকার বিবিসি বাংলাকে বলছেন, নিত্যদিনের ব্যবহার জন্য যেসব গহনা, যেমন- আংটি, চেইন, ব্রেসলেট, কানের দুল তৈরিতে ২১ ক্যারেট স্বর্ণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অনেক সময় সূক্ষ ডিজাইনের গহনার জন্যও এটি ব্যবহার করা হয়।
এছাড়া ৭৫ শতাংশ স্বর্ণ এবং বাকি ২৫ শতাংশ অন্য ধাতু মিলে ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ।
"হীরা বা অন্যান্য দামি পাথরের সঙ্গে সেট করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত এটি। কারণ এই ক্যারেটের স্বর্ণ অনেক বেশি শক্ত হয় এবং পাথরকে মজবুতভাবে ধরে রাখতে পারে," বলেন মি. সরকার।

ছবির উৎস, Getty Images
খাঁটি স্বর্ণ চিনবেন যেভাবে?
খাঁটি স্বর্ণ চেনার সব থেকে সহজ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উপায় হচ্ছে হলমার্ক টেস্ট।
হলমার্ক হচ্ছে অলংকারের গায়ে খোদাই করে চিহ্নিত নির্দিষ্ট সংখ্যা যা স্বর্ণের গুণগত মান সম্পর্কে ধারণা দেয়।
আন্তর্জাতিক গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুসারে, হলমার্ক সংখ্যা হিসেবে ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের জন্য ৯৯৯.৯, ২২ ক্যারেটের জন্য ৯১৬, ২১ ক্যারেটের জন্য ৮৭৫ এবং ১৮ ক্যারেটের জন্য ৭৫০ সংখ্যা ব্যবহার হয়।
এই সংখ্যাগুলো নির্দিষ্ট ক্যারেটের পরিচয় হিসেবে গহনার গায়ে খোদাই করে লেখা থাকে।
বাংলাদেশে হলমার্ক করা স্বর্ণের অলংকার বিক্রি বাধ্যতামূলক করা হলেও তা অনেক জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানই এখনো মানছে না বলে জানান স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা।
বাজুস সভাপতি এনামুল হক খান দোলন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, গহনা কেনার সময় ক্যারেট অনুযায়ী গহনার গায়ে থাকা হলমার্ক সিলটি দেখে নেওয়া জরুরি।
তিনি জানান, বাংলাদেশে জুয়েলারি ��্যবসায় জড়িত সবাই যেন হলমার্ক করা স্বর্ণ ব্যবহার করেন সেটি নিশ্চিতে কাজ করছেন তারা।
"আমরা হলমার্কিংয়ের জন্য অনলাইন পদ্ধতি চালু করছি। একটি কোডের মাধ্যমে মোবাইল অ্যাপ দিয়ে গ্রাহক সহজেই জানতে পারবেন যে গহনাটি তিনি কিনছেন সেটা কোন দোকান থেকে কেনা, কত ক্যারেট, আসল না নকল," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. দোলন।
এছাড়া স্বর্ণের আসল-নকল যাচাইয়ে নাইট্রিক এসিড টেস্ট, চুম্বক পরীক্ষা, পানির পরীক্ষা এবং সিরামিক প্লেট টেস্টের মতো কিছু প্রচলিত পদ্ধতিও রয়েছে।
হলমার্ক করার পাশাপাশি 'কেডিএম সোনা' নামেও একটি ধরনের স্বর্ণের প্রচলন রয়েছে। যেখানে নরম স্বর্ণকে গহনা তৈরির উপযোগী করতে ক্যাডমিয়াম নামক এক ধরনের ধাতু মেশানো হয়।
ক্যাডমিয়াম মেশানোর ফলে স্বর্ণের মান বজায় থাকলেও গহনার কারিগর এবং ব্যবহারকারীদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে বলে বর্তমানে স্বর্ণে ক্যাডমিয়াম মেশানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
স্বর্ণের দাম নিয়ে জটিলতা
গত কয়েক বছর ধরেই উর্ধ্বমুখী স্বর্ণের বাজার। পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় তিনগুণ হয়েছে মূল্যবান এই ধাতুর দাম।
এই সময় অনেকে যেমন স্বর্ণ ক্রয়ের পরিমাণ কমিয়েছেন আবার অনেকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ কিনছেনও।
সম্প্রতি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম পৌঁছেছিল দুই লাখ ৮৬ হাজার টাকার কাছাকাছি। অস্থির স্বর্ণের বাজারে দাম ওঠানামা করছে অনেক বেশি। এমন প্রেক্ষাপটে স্বর্ণের দাম নির্ধারণ এবং এর একক সম্পর্কেও ধারণা রাখা জরুরি।
কারণ স্বর্ণের ওজন মাপার আন্তর্জাতিক একক এবং বাংলাদেশে প্রচলিত এককের কারণে সঠিক দাম বুঝতে অনেক সময় জটিলতা তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বর্ণ, রূপাসহ এই ধরনের দামি ধাতুর ওজন মাপার জন্য 'ট্রয় আউন্স' একক ব্যবহার করা হয়, যা আউন্স এককের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। এছাড়া স্বর্ণের জন্য 'গ্রাম' একক অনেক বেশি প্রচলিত।
এক আউন্স সমান ২৮ দশমিক ৩৫ গ্রাম হলেও, এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১ দশমিক ১০ গ্রাম।
অবশ্য বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় স্বর্ণের ওজনের ক্ষেত্রে প্রাচীন ভারতীয় ওজন পরিমাপের একক 'ভরি' শব্দটি অত্যন্ত পরিচিত। এছাড়া রতি এবং আনা এককগুলোও প্রচলিত।
সংখ্যার হিসেবে, এক ভরি সমান ১১ দশমিক ৬৬ গ্রাম এবং ২ দশমিক ৪৩ ভরি সমান এক ট্রয় আউন্স। আর আট রতি সমান এক আনা এবং ১৬ আনায় এক ভরি।
মূলত ব্রিটিশ আমল থেকে ভরি শব্দটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। আন্তর্জাতিক দশমিক পদ্ধতি আসার অনেক আগে থেকেই এই অঞ্চলে মানুষ 'রতি', 'আনা' এবং 'ভরি'র হিসেবে অভ্যস্ত ছিল।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি এনামুল হক খান দোলন বলছেন, "পূর্বের জেনারেশন যারা এখনো জীবিত আছেন তারা এটাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু আমাদের যত হিসাব-নিকাশ বা নতুন জেনারেশন যারা এই ব্যবসাতে আছে তারা সবাই গ্রামে হিসাব করে।"
তার মতে, স্বর্ণের ওজন হিসাবের জন্য 'গ্রাম' হলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, তাই গ্রাম ব্যবহার করাই বেশি নির্ভুল।








